ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬ , ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল। সেই সঙ্গে আমাগো বাজানরেও ছাড়লো না"


আপডেট সময় : ২০২৬-০৭-০৯ ২৩:৪২:১২
নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল। সেই সঙ্গে আমাগো বাজানরেও ছাড়লো না" নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল। সেই সঙ্গে আমাগো বাজানরেও ছাড়লো না"
 
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
‘নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল। সেই সঙ্গে আমাগো বাজানরেও ছাড়লো না। দুইটা টিনের ঘর, দুইটা আম গাছ আর একটা কাঁঠাল গাছ কেটে নেওয়ার আগেই নদীতে চলে গ্যাইছে। বাকি ঘর সরানোর সময় নদীর দিকে তাকিয়ে বাজান হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল। এরপর আর একটা কথাও কইলো না। আমাগো বাজান আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।'
 
কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ গ্রামের বাসিন্দা মোঃ মিজান ইসলাম (২৫)। তিনি জানান, আজ বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) সকাল ৭টার দিকে তিস্তা নদীর ভাঙন থেকে বসতঘর সরানোর সময় তার বাবা মোঃ আব্দুল সালাম (৪৫) ভাঙনের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
 
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার ( ০৯জুলাই ) কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। আপাতত তিস্তার পূর্ব তীরে ভাঙন কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও পশ্চিম তীরের চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ এলাকায় চলছে ব্যাপক ভাঙন। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী অব্যাহতভাবে তীর গিলে খাচ্ছে।
 
নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, গাছপালা ও বিস্তীর্ণ আবাদি জমি। কৃষকদের বাদাম, আমনের বীজতলা, মরিচ, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, পাট ও ভুট্টার ক্ষেত ইতোমধ্যেই নদীতে তলিয়ে গেছে। প্রবল স্রোত ও বাতাসের কারণে কিছুক্ষণ পরপরই নতুন নতুন অংশ নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখা, চর চতুরা, চর রামহরি ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁ, চর গতিয়াসাম এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
 
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আশরাফুল আলম ও মোঃ মাঈদুল ইসলাম জানান, গত চার দিনে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রামের কমপক্ষে ৮টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এরমধ্যে চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মোঃ মমিনুল ইসলাম (৪০), মোঃ আব্দুল সালাম (৪৫), মোঃ কাফি হোসেন (৪০) ও মোঃ জয়নাল ইসলাম (৬০) বসতবাড়ি সম্পূর্ণ নদীতে চলে গেছে। এছাড়া চর তৈয়বখাঁ গ্রামের মোঃ ফকরুল ইসলাম (৪৫) ও মোঃ আব্দুর সাত্তারের (৪০) বাড়িও ভাঙনের শিকার হয়েছে।
 
চর তৈয়বখাঁ গ্রামের মোঃ ফকরুল ইসলাম বলেন, ‘এই নিয়ে তিনবার বাড়ি সরাইলাম। এখন আমার আর থাকার মতো কোনো জমিই নাই। কোথায় যামু, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।’
 
চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মোঃ মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ভাঙন পূর্বচর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মসজিদের একেবারে কাছে চলে এসেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। এতে শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহর এবাদতের ঘর দু’টিও রক্ষা করতে পারছি না। এছাড়া দুই শতাধিক পরিবার এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।’
 
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ তাইজুল ইসলাম বলেন, চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার আনন্দবাজার এলাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বুধবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আমার সঙ্গে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।’
 
কুড়িগ্রাম জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন, জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদীতীর রক্ষায় প্রায় ৩০টি পয়েন্টে দুই লাখ জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে চরাঞ্চলে কাজ করার জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকায় সেখানে এখনো কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
 
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ডঃ মোঃ আতিক মোজাহিদ বলেন, ভাঙনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে (ডিজি) জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin

কমেন্ট বক্স

প্রতিবেদকের তথ্য

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ